নগদ অর্থ লেনদেনের সীমা নির্ধারণ করে দেয়ায় ব্যবসায়ীরা করপোরেট কর হ্রাসের (ট্যাক্স কাট) সুবিধা নিতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। তারা কোম্পানির কর হারের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেনের শর্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে। বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশী কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি) সমন্বিত করব্যবস্থা প্রণয়ন এবং এনবিআরের করনীতি ও রাজস্ব সংগ্রহ শাখাকে পৃথক করার দাবি জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (৪ মার্চ) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় তারা এসব দাবি জানান। এনবিআর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান।
এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, ‘রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান যৌক্তিক নয়। এটার সংস্কার করা হোক। কোম্পানিগুলোর কর হার এবং কার্যকরী কর হার বিগত অর্থবছরগুলোতে শর্তসাপেক্ষে করপোরেট কর হার ধারাবাহিকভাবে কমানো হলেও, অর্থ আইন ২০২৪ অনুযায়ী নগদ লেনদেনের শর্তাবলীর কারণে কেউই এ সুবিধা ভোগ করতে পারছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি ৮০ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক এবং সম্পূর্ণ ব্যাংকিং নির্ভর নয়। ফলে বড় ও মাঝারি কোম্পানির জন্য এ শর্ত পালন করা অত্যন্ত কঠিন।’
তিনি বলেন, ‘কার্যকরী কর হার অতিমাত্রায় বেশি, যা উৎসের কর কর্তন ও অননুমোদিত ব্যয়ের ফলে ক্ষেত্রবিশেষে ৪০-৫০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। করপোরেট কর হার বাস্তবিক হারে কমানোর পাশাপাশি, অগ্রিম আয়কর ও টার্নওভার কর নীতির সংস্কার প্রয়োজন, যাতে কর আয়ভিত্তিক হয়, টার্নওভারের ওপর নয়।’ এছাড়া কর প্রশাসনের উন্নয়ন ও স্বয়ংক্রিয় ডিজিটালাইজেশন চালুর মাধ্যমে কর ফাঁকি কমানো এবং রাজস্ব আয় বৃদ্ধির সুযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। তাই কোম্পানির কর হারের ক্ষেত্রে নগদ লেনদেনের শর্ত বাতিলের আবেদন জানান তিনি।
বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশী কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি এবং ইউনিলিভার বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাভেদ আখতার লিখিত বক্তব্যে প্রস্তাবনা তুলে ধরেন। তিনি সমন্বিত করব্যবস্থা প্রণয়ন এবং এনবিআরের করনীতি ও রাজস্ব সংগ্রহ শাখাকে পৃথক করাসহ বিভিন্ন দাবি জানান।
ফিকির কনসালটেন্ট স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র (পিএসআর) সংগ্রহ করার জন্য অনেক কোম্পানিতে লোক রাখতে হচ্ছে। এটা কোম্পানিগুলোর জন্য বাড়তি ব্যয়। পিএসআরের ডাটাবেজ যেন আপডেট থাকে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যেন এটা আপডেট করে। তাহলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এ চাপ নিতে হবে না। এনবিআরের গবেষণা ও পরিসংখ্যান বিভাগকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। সবুজ শিল্পায়নের জন্য ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল, লিথিয়াম ব্যাটারি ও জুট শিল্প খাতে করছাড় দেয়া হোক। সরকারি কর্মচারীরা শুধু বেতনের ওপর কর দিলেও বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদের বেতনসহ সব কিছুতেই কর দিতে হয়। এটা বৈষম্য, এটার নিরসন করা হোক।’
এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, ‘আমরা ভ্যাটের হার কমিয়ে সিঙ্গেল রেট নির্ধারণ করতে চাই। ভ্যাট আদায়, ভ্যাট চালান ইস্যু, হিসাবরক্ষণ, রিটার্ন দাখিলসহ ভ্যাটের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করতে একটি ন্যাশনাল সিস্টেম চালু করা হবে। স্বপ্ন দেখতে তো অসুবিধা নেই। হয়তো ত্রিশ বছর সময় লাগবে, লাগুক। আমরা শুরু করতে চাই। আমাদের দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করেই এটি চালু করা হবে। এখন অনেকগুলো কোম্পানিকে ভ্যাট সফটওয়্যার তৈরির অনুমোদন দেয়া রয়েছে। তারা ভিন্ন ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে সফটওয়্যার তৈরি করছে। একই বিষয়ে এত জনবল কাজ করছে, এতে জনবলের অপচয় হচ্ছে। আমরা নির্দিষ্ট একটি ন্যাশনাল সিস্টেম চালু করবো। এতে ভোগান্তি কমে আসবে। ব্যবসায়ীরা ওই সিস্টেম ব্যবহার করে ভ্যাটের সব কাজ সমাধান করতে পারবেন।’
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘করফাঁকির অপরাধ কখনো তামাদি হয় না। আইনের এ ধারা পরিবর্তন করা হবে না। আগামী বাজেটে আয়কর আইনে অনেক পরিবর্তন ও সংশোধন করা হবে। আগামী বছর থেকে করপোরেট রিটার্ন অনলাইনে দাখিল বাধ্যতামূলক করা হবে। জেনে-শুনে অনেক চাটার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অসত্য অডিট রিপোর্টে সই করেন। ব্যবসায়ীরা তাদের লেনদেনের সব তথ্য প্রদর্শন করেন না।’
এনবিআরের সদস্য (কাস্টমস নীতি) হোসেন আহমদ বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ভ্যালুয়েশন চ্যালেঞ্জের বিষয়। আমরা সমস্যাগুলো শুনতে চাই। সমাধানও করব।’
প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআরের সদস্য (আয়কর নীতি) এ কে এম বদিউল আলম, এমসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি হাবিবুল্লাহ এম করিম, সহসভাপতি সিমিন রহমান ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্য আদিব হোসেন খানসহ এমসিসিআই, ফিকি ও এনবিআরের আরো অনেকে উপস্থিত ছিলেন।